ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন একে অপরের থেকে বহু দূরে হলেও আজ এই তিন অঞ্চল একটি অদ্ভুত মিলের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই মিলের কেন্দ্রে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ধারাবাহিক মিথ্যাচার, নৈতিক শূন্যতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে ইউরোপীয় নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের দ্বিধা ও দুর্বলতা—এই তিন সংকটকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি করেছিলেন—গড়ে দিনে প্রায় ২১টি। দ্বিতীয় মেয়াদেও এই প্রবণতায় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ ও বিশ্ববাসীর সামনে সত্যকে বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়াও আবার প্রমাণ করেছে, সত্য ও নৈতিকতার প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই আচরণ শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে অনৈতিক ও বিপজ্জনক।
সময়ের সঙ্গে অনেক বিশ্বনেতা ও ভোটার ট্রাম্পের মিথ্যাচারের সঙ্গে যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার বা চুপ করে থাকার মূল্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও প্রতারণা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি সেখানে ছড়িয়ে আছে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া প্রয়োজন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই যুদ্ধজাহাজ? গ্রিনল্যান্ডবাসীও ট্রাম্পের বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ডেনমার্ক জানিয়েছে, তারা সেখানে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং চীনা বিনিয়োগের যে গল্প ট্রাম্প বলছেন, তা সম্পূর্ণ বানানো। জনমত জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী; তারা স্বাধীনতাই চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ‘নিরাপত্তা’–সংক্রান্ত ভাষ্য আসলে একটি ছদ্মাবরণ। বাস্তবে তাঁর লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন।
এই তিন সংকটে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা ও বিভক্তি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউরোপের এখন বুঝে নেওয়া উচিত, ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা বা তাঁর ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিটকে অনেকের কাছে শুধু ভুল সিদ্ধান্ত নয়, প্রায় আত্মঘাতী বলেই মনে হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের আগে ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর প্রশাসন ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের সন্দেহে শতাধিক মানুষকে হত্যা করে—যাচাই–বাছাই ছাড়াই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা দিয়ে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতাও পাশ কাটান।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলমান। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলায় তাঁর লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়। বরং মূল লক্ষ্য দেশটির বিপুল তেলসম্পদ। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভেনেজুয়েলাকে অর্থনৈতিকভাবে লুট করছেন এবং একই সঙ্গে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়ার প্রতিও হুমকি দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে—ট্রাম্পের মিথ্যাচার ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্ব ব্যবস্থার জন্যই এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
Jatio Khobor