বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশে রোল নম্বর ২২—আয়েশা আক্তার দ্বিতীয় হয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। সাধারণত এমন খবরে স্কুলজুড়ে আনন্দ, শিক্ষক-সহপাঠী আর অভিভাবকদের মুখে হাসি থাকার কথা। কিন্তু আয়েশার ক্ষেত্রে ফলাফলের এই সাফল্য এখন শুধুই নীরব শোকের বার্তা। কারণ, ফল দেখার জন্য আয়েশা আর বেঁচে নেই।
রাতের অন্ধকারে ঘরের ভেতর আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে সাত বছরের ছোট্ট আয়েশা। নতুন বই-খাতা নিয়ে তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসে গিয়ে রোলকল শুনে ‘উপস্থিত’ বলার সুযোগ আর হবে না তার।
আয়েশার বাবা বেলাল হোসেন কণ্ঠভাঙা স্বরে বলেন, ‘মেয়ের রেজাল্ট হইছে। ভালো করছে। সেকেন্ড হইছে। কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়া আর কী হবে?’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সূতারগোপ্টা এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে আয়েশা ছিল সবার ছোট। গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে তাঁদের বাড়িতে ভয়াবহ আগুন লাগে। বেলাল হোসেনের অভিযোগ, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয়।
আগুন লাগার সময় পাকা ভিত্তির টিনের ঘরের তিনটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিল পুরো পরিবার। বেলাল হোসেন স্ত্রী ও চার সন্তানকে কোনোভাবে বের করতে পারলেও ছোট মেয়ে আয়েশাকে বাঁচাতে পারেননি। আগুনের ভেতর থেকে বাবাকে ‘আব্বু, আমাকে নাও’ বলে ডাকলেও তীব্র আগুনে কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাবার চোখের সামনেই পুড়ে মারা যায় শিশুটি।
এই অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয় বড় মেয়ে সালমা আক্তারও। রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে দুই মেয়েকে হারান বেলাল হোসেন ও নাজমা বেগম দম্পতি।
ছোট মেয়ে আয়েশার দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছিল আগুন লাগার আগের দিন। ফলাফলে দেখা গেছে, ছয় বিষয়ে মোট ৫০০ নম্বরের মধ্যে সে পেয়েছে ৪৪৩ নম্বর। পড়াশোনায় মনোযোগী আয়েশার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার কিংবা শিক্ষক হওয়ার।
ফাইভ স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নোমান ছিদ্দিকী বলেন, ‘আয়েশা ভালো ফল করেছে, কিন্তু আমরা সেই আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না। তার বন্ধুরা প্রায়ই কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকে। পুরো ঘটনাটি আমাদের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে।’
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তালা উদ্ধার করেছে এবং একটি মামলা হয়েছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের পাশে এখন আত্মীয়ের বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন বেলাল হোসেন ও তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, ‘যার দুইটা সন্তান একসঙ্গে মারা যায়, তার আর কী থাকে?’
আয়েশার ভালো ফলের খবর আজ আর কোনো উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়—এটি শুধু একটি নিভে যাওয়া স্বপ্নের করুণ স্মারক।
Jatio Khobor