ভেনেজুয়েলার কট্টর সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বাহিনীর হাতে আটক করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। এই অভ্যুত্থান উসকানিহীন, অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভেনেজুয়েলার ওপর সরাসরি সামরিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ক্ষমতার এক ভয়ংকর প্রদর্শন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন যে আগ্রাসী নীতির পথে হাঁটছে, এটি তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ। একই সময়ে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধেও সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির আক্রমণাত্মক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ট্রাম্প দাবি করছেন, ভেনেজুয়েলা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও তথাকথিত ‘অপরাধী’ অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতেই এই অভিযান। তবে ইরাক আগ্রাসনের মতোই, এবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ—এমন অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের ঘটনাগুলো সেই সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য শুধু কৌশলগত নয়, ব্যক্তিগতও। মাদুরোর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং উনিশ শতকের মনরো নীতিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা—অর্থাৎ পুরো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য—এই অভিযানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এই ঘটনায় লাতিন আমেরিকার দেশগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোসহ আঞ্চলিক নেতারা আশঙ্কা করছেন, ওয়াশিংটনের এই নতুন আগ্রাসী নীতি ভবিষ্যতে তাদের দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। কিউবা, পানামা ও অন্যান্য দেশ ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা দেখছে।
বিশ্ব রাজনীতির বড় শক্তিগুলোও এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরান এই অভ্যুত্থানকে নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো পুরোপুরি অসন্তুষ্ট নন, আর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের জন্য এটি একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করল—যা ভবিষ্যতে তাইওয়ান প্রশ্নে অনুসরণ করা হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও জাতিসংঘকে উপেক্ষা করেছে এবং সংকট সমাধানের কূটনৈতিক পথ এড়িয়ে গেছে। ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা দীর্ঘস্থায়ী নৈরাজ্যের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ট্রাম্প নিজেকে ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তাঁর শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হামলা বেড়েছে। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও ইরানে বোমা হামলার নজির তাঁর তথাকথিত শান্তিকামী ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো নিজেই জানেন না তিনি যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে কী করছেন—অথবা আরও ভয়ংকর ব্যাখ্যা হলো, তিনি সবই জানেন এবং ক্ষমতা ও উত্তরাধিকার গড়তে ইচ্ছাকৃতভাবেই বিশ্বকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ভেনেজুয়েলায় এই ‘সাফল্য’ তাঁকে আরও বড় ও বিপজ্জনক আগ্রাসনের পথে উৎসাহিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে, মাদুরো অপসারণ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার জন্য এক গুরুতর সতর্কবার্তা। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতির দায় শেষ পর্যন্ত তাঁর কাঁধেই বর্তাবে।
Jatio Khobor