আসন্ন গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সক্রিয় প্রচারণা শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির অংশ। তবে সমালোচকদের মতে, কেবল সচেতনতা তৈরির পরিবর্তে সরকার একটি নির্দিষ্ট পক্ষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে, যা সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকার মূলত দুটি কারণে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার–সংক্রান্ত অঙ্গীকার ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে সরকারের আস্থাহীনতা। দ্বিতীয়ত, সংস্কার প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা ও ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা। সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যক্রমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রাজনৈতিক দলগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারবে কি না—এ নিয়ে সরকারের ভেতরে গভীর সংশয় রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাজনীতিবিদদের হাতেই যদি সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে, তবে গত পাঁচ দশকে কেন সেগুলো কার্যকর হয়নি। তাঁর মতে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ও মানসিকতার পরিবর্তনে অনীহার কারণে রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
তবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে সংস্কারের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি—এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। অতীতে কিছু ইতিবাচক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই পরে বাতিল বা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও ভবিষ্যতে এসব সংস্কার টেকসই থাকবে—এর নিশ্চয়তা কে দেবে?
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংস্কার তখনই কার্যকর ও টেকসই হবে, যখন জনগণ নিজেরাই ধীরে ধীরে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব অনুভব করবে। কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি প্রকাশ্য আস্থাহীনতা প্রকাশ করাও সরকারের জন্য শোভন নয় বলে মত অনেকের। কারণ, এসব রাজনৈতিক দলই সরকার আয়োজিত সংস্কারসংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে এবং ঐকমত্য কমিশনসহ বিভিন্ন ফোরামে মতামত দিয়েছে। তবু সমালোচকেরা বলছেন, এসব দল দেশের সব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের একটি অংশের মতামত প্রতিফলিত হয়নি।
আইনগতভাবে সরকার গণভোটে কোনো পক্ষ নিতে পারে—সরকারের এমন ব্যাখ্যাও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন কেবল লিখিত বিধানেই সীমাবদ্ধ নয়; নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার মতো অলিখিত নীতিও আইনের অংশ। সংসদ অকার্যকর থাকায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা এই সরকারের ওপর নিরপেক্ষ থাকার দায় আরও বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে সিভিল সার্ভিস ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা একদিকে নির্বাচন কমিশনের হয়ে নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনা করছেন, অন্যদিকে সরকারের নির্দেশনায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় যুক্ত রয়েছেন—যা নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচকদের মত।
ব্রেক্সিট গণভোটের সময় যুক্তরাজ্যেও সরকারের প্রচারণায় সিভিল সার্ভিসের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। পরবর্তী সংসদীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে জনমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সরকারি প্রচারণায় কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে—তা স্পষ্ট নয়, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দল নয়, তাই কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নেওয়া তাদের জন্য বেমানান। ভবিষ্যতে যদি সংস্কার সত্ত্বেও স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসে, তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ার নকশাকার হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের দায়দায়িত্ব কী হবে—সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
সব মিলিয়ে, গণভোটকে ঘিরে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই নয়, বরং নিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও জবাবদিহি নিয়ে গভীর আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
Jatio Khobor